বাংলা রচনা সমগ্র

ডেঙ্গুজ্বর ও তার প্রতিকার রচনা

ভূমিকা :

এডিস মশাবাহিত ভাইরাসজনিত এক ধরনের তীব্র জ্বরের নামই ডেঙ্গুজ্বর। বাংলাদেশে ১৯৬৪ সালে সর্বপ্রথম ডেঙ্গুজ্বর ধরা

পড়ে। এরপর থেকে কমবেশি ডেঙ্গুজ্বরের আক্রান্ত রোগী প্রতিবছরই পাওয়া যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেঙ্গুজ্বরেরপ্রাদুর্ভাব ব্যাপক আকারে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা বড় বড় শহরে জ্বরের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি। গতবছরে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত অনেক রোগী মারাও গেছে। ডেঙ্গুজ্বর বিষয়ে যদিও বর্তমানে বেশি আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে, তবুও ভয়ের তেমনকারণ নেই। এর প্রতিকার প্রতিরোধ অনেকটা সহজ, এমনকি নিশ্চিত।

ডেঙ্গু বাহকের পরিচয় :

ডেঙ্গুজ্বরের জীবাণু বহনকারী মশাটির নামএডিস এটি দেখতে অন্যান্য মশার মতো হলেও সামান্য কিছু পার্থক্য রয়েছে। পার্থক্যই অন্যান্য মশা থেকে এডিসকে পৃথক করেছে। এডিস মশা দেখতে গাঢ় নীলাভ কালো রঙের। মশার সারা শরীরেসাদাকালো ডোরাকাটা দাগ রয়েছে। এর পেছনের পাগুলো সামনের চাইতে অপেক্ষাকৃত লম্বাটে ধরনের হয়ে থাকে।

মূলত, দুই প্রজাতির স্ত্রী মশা ডেঙ্গুজ্বরের জীবাণু বহন করে থাকে। এর একটি প্রজাতির নাম এডিস এজিপটাই অন্যটির নামএডিস এলবোপিকটাস।

ডেঙ্গুজ্বরের উদ্ভব বিস্তার :

পৃথিবীতে এডিস মশার প্রথম উপস্থিতি আফ্রিকার জঙ্গলে এবং সেখান থেকে পরবর্তীতে বিভিন্ন বাহকের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্নদেশে এডিস মশার বিস্তার ঘটেছে। সর্বপ্রথম জাহাজের মাধ্যমে সমুদ্রপথে এডিস মশা আফ্রিকা থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে।১৯৩৯ সালে এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ডেঙ্গুভাইরাস সনাক্ত করা হয়। বাংলাদেশে ১৯৬৪ সালে থাইল্যান্ডেরএকদল বিশেষজ্ঞ প্রথম ডেঙ্গুজ্বর সনাক্ত করেন। বিশ্বের অনেক দেশের মতো প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল, বার্মা এবংশ্রীলঙ্কাতেও ডেঙ্গুজ্বরের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যায়।

ডেঙ্গুজ্বরের প্রকারভেদ :

ডেঙ্গুজ্বর সাধারণত দুধরনের হয়ে থাকে। যেমনক্ল্যাসিক্যাল বা সাধারণ ডেঙ্গুজ্বর হেমোরেজিক ডেঙ্গুজ্বর। এই ভাইরাসেরআবার চারটি সেরোটাইপ আছে।

এগুলো হচ্ছে– DEN-, DEN-, DEN- DEN-8

এর যেকোনো একটি দ্বারা আক্রান্ত হলেই ডেঙ্গুজ্বর হতে পারে। তবে এগুলোর মধ্যে DEN- এবং DEN- মারাত্মক। এ দুটি সেরোটাইপের ডেঙ্গুভাইরাস হেমোরেজিক ডেঙ্গুজ্বরের কারণ।

এডিস মশার বিচরণ বংশবিস্তার :

এডিস মশা সমতলে যেমন বিচরণ করে, তেমনি অনেক উঁচুতেও উড়তে সক্ষম। সমুদ্রপৃষ্ঠের এক হাজার ফুট থেকে আড়াই হাজারফুট উচ্চতায় এডিস মশার বিচরণ লক্ষ্য করা যায়। এডিস এজিপটাই স্ত্রী মশা কোনো ব্যক্তিকে কামড় দিলে সেই ব্যক্তি চার থেকেছয় দিনের মধ্যে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তিটিকে জীবাণুবিহীন কোনো স্ত্রী এডিস মশা কামড় দিলে সেইমশাটিও ডেঙ্গুজ্বরের জীবাণুবাহী মশায় পরিণত হয়। এডিস মশা রাতের বেলায় কামড়ালেও সাধারণতদিনের বেলাতেই বেশিকামড়ায়। সকালের প্রথম ভাগে এবং সন্ধ্যার পূর্বভাগে মশা বেশি কামড়ায়। এডিস মশার বংশবৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ হচ্ছেঝোপজঙ্গল এবং জমে থাকা পানি। সাধারণত ড্রেন, পুকুর বা নদীর পচা পানিতে এই প্রজাতির মশা ডিম পাড়ে না, ডিম পাড়েপ্রাকৃতিক কৃত্রিম পাত্রের পানিতে। প্রাকৃতিক পাত্রের মধ্যে প্রধান হচ্ছে গাছের কোটর, বাঁশের খুঁড়ির কোটর পত্রবৃন্ত ইত্যাদি।আর কৃত্রিম পাত্রের মধ্যে ফুলদানি, ফুলের টব, মাটির হাঁড়ির ভাঙা অংশ, অব্যবহৃত টিনের কৌটা, গাড়ির টায়ার, প্লাস্টিকেরবোতল, মুখ খোলা পানির ট্যাংক ইত্যাদি প্রধান।

ডেঙ্গুজ্বরের লক্ষণ বা উপসর্গ :

ক্লাসিক্যাল বা সাধারণ ডেঙ্গজ্বরের ক্ষেত্রে যে সকল উপসর্গ দেখা যায় সেগুলো হচ্ছে মাংসপেশি হাড়ে প্রচণ্ড ব্যথা এবং দেহেরতাপমাত্রা ১০৪ থেকে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত ওঠে যায়। এছাড়া বমি, পেটব্যথা, মাথা ব্যথা, কোমর ব্যথা, অস্থিসন্ধি বাজয়েন্ট ব্যথা এবং চোখের মাংসপেশিতে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। জ্বর হওয়ার / দিন পর দেহে এক ধরনের ফুসকুড়ি ওঠে। মাংসপেশিরখিচুনিতে কখনো কখনো রোগী অজ্ঞান হয়ে যায়। সাধারণত শিশুকিশোররা এই জ্বরে আক্রান্ত হয়বেশি। /১০ দিন ভাগের পরউপসর্গগুলো আস্তে আস্তে কেটে যেতে থাকে। তবে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে সময় লাগে বেশ কিছুদিন।

হেমোরেজিক বা রক্তক্ষরা ডেঙ্গুজ্বর খুবই মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গুজ্বরের সকল উপসর্গ ক্ষেত্রেব্যাপক আকার ধারণ করে। এক্ষেত্রে তিন থেকে সাত দিনের মধ্যে রক্তের সংবহনতন্ত্রে জটিলতা দেখা দেয়। তখন রক্তনালীতে ত্বকের নিচে রক্ত জমাট বেঁধে যায়। দাঁতের মাড়ি নাক দিয়ে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। এর সাথে যোগ হয় রক্ত বমি মলদ্বার দিয়েরক্তপড়া।রক্তক্ষরণের ফলে হাইপোভলিউমিক শকে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হয়ে থাকে। অবস্থাকে বলা হয় ডেঙ্গু শক সিনড্রোম

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা :

ডেঙ্গুজ্বরের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা এখনোউদ্ভাবন হয়নি। নেই প্যাটেন্টকৃত কোনো ওষুধ।ক্লাসিক্যাল এবং হেমোরেজিক ডেঙ্গুজ্বর উভয় ক্ষেত্রেই চিকিৎসা উপসর্গ অনুযায়ী করতে হবে। এক্ষেত্রে জ্বর বা ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল এবং বমির জন্য স্টিমিটিল জাতীয় ওষুধ দেয়া হয়। এছাড়া ডেঙ্গুজ্বরের রোগীকে প্রচুর পানি খাওয়াতে হয়।হেমোরেজিক ডেঙ্গুজ্বরের ক্ষেত্রে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে প্রতিদিন রক্তের প্লেটলেট কাউন্ট এবং পি সি ভি পরীক্ষা করাতে হবে। কারণ হেমোরেজিক ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীর প্লেটলেট কাউন্ট কমে যেতে পারে। প্লেটলেট কাউন্ট ১০ হাজারের নিচে নেমে গেলে রোগীকে শিরাপথে প্লেটলেট ট্রান্সফিউশন করতে হবে। আর যদি রোগীর লক্ষণীয় রক্তক্ষরণ হয় তাহলে রোগীকে রক্ত দিতে হবে। ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীর ব্যথার জন্য এসপিরিন জাতীয় ওষুধ দেয়া যাবে না। কারণ এতে রক্তক্ষরণের প্রবণতা আরওবেড়ে যায়।

প্রতিরোধ :

ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হলে আমাদের প্রধান করণীয় হচ্ছে চিকিৎসকের সাহায্য নেয়া এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

এডিস মশা ডেঙ্গুজ্বরের বাহক, তাই বাহক মশা দমন করাই ডেঙ্গুজ্বর প্রতিরােধের প্রধান উপায়। বাসগৃহের ফুলের টব, অব্যবহৃত টিনের কৌটা, ড্রাম, নারকেলের মালা, ডাবের খোসা, গাড়ির টায়ার ইত্যাদিতে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে। তাই এডিস মশা দমনে এসব পানি জমার স্থান ধ্বংস করতে হবে। বাড়িঘর আশপাশের ঝোপজঙ্গল পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।

ঘরে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। এডিস মশা যেহেতু দিনের বেলা কামড়ায় সেহেতু দিনের বেলায়ও ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করতে হবে। সর্বোপরি ডেঙ্গুজ্বর প্রতিরোধে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।

উপসংহার :

সাম্প্রতিককালে নতুন আতঙ্ক ডেঙ্গুজ্বরের কালো থাবা ছিনিয়ে নিয়েছে অনেক জীবন, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানেরসফলতার

যুগে কারোরই কাম্য নয়। তাই ডেঙ্গুজ্বরের প্রাদুর্ভাব যাতে রোধে কার্যকর  করা যায় এবং এর কারণে আর কোনো অমূল্য জীবনযেন হারিয়ে না যায় সেজন্য আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button