Biographyবাংলা রচনা সমগ্র

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ( রচনা)

ভূমিকা:

যুগ হতে যুগান্তরে যার হাত ধরেই স্বাধীন বাংলাদেশের পথ চলা।যার রক্তে আগুন জ্বলা কন্ঠে এদেশের মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিলস্বাধীনতার যুদ্ধে তিনি আর কেউ নন তিনিই স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুররহমান।

হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙালির শ্রেষ্ঠতম অর্জন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আর এই স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে যারনাম চিরস্মরণীয় হয়ে আছে , তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তিনি বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা , বাংলাদেশেরজাতির পিতা পাকিস্তান সৃষ্টির অল্প কিছুদিন পরেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে বৈষম্য আর পরাধীনতার গ্লানি নিপীড়িত জাতিরভাগ্যাকাশে যখন দুর্যোগের কালোমেঘ , তখনই শেখ মুজিবুর রহমানের গৌরবময় আবির্ভাব অসাধারণ দেশপ্রেম দূরদর্শীনেতৃত্ব দিয়ে তিনি সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতি তাই ভালোবেসে তাঁকে বঙ্গবন্ধুজাতিরপিতার মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন।

শিক্ষা কর্মজীবন :

স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়াগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন পিতা শেখ লুৎফর রহমান , মাতা সায়রা খাতুন দুই ভাই , চার বোনের মধ্যে শেখ মুজিব ছিলেন সবারবড় পারিবারিক আনন্দঘন পরিবেশে টুঙ্গিপাড়ায় তার শৈশবকৈশোরের দিনগুলো কাটে গিমাডাঙ্গা প্রাইমারি স্কুলে প্রাথমিকশিক্ষা শেষ করার পর তিনি গোপালগঞ্জ মিশন হাইস্কুলে ভর্তি হন এবং এই স্কুল থেকে ১৯৪১ সালে তিনি ম্যাট্রিক পাস করেন এই সময় তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন কলকাতা ইসলামি কলেজ থেকে ১৯৪৪ সালে আইএ এবং ১৯৪৭ সালে বিএপাস করেন তিনি ১৯৪৬ সালে ইসলামিয়া কলেজ ছাত্রসংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন ছাত্র শেখ মুজিবুর রহমানক্রমেই নেতা মুজিবে বিকশিত হতে থাকেন ১৯৪৭ দেশ বিভাগের পর তিনি আইন পড়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন ১৯৪৮ সালে গঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের তিনি ছিলেন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিমলীগ গঠিত হলে তিনি যুগ্ম সম্পাদকের পদ লাভ করেন এবং ১৯৫৩ সালে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন ১৯৫৪ সালেযুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার মন্ত্রিত্ব লাভ করেন দেশের মানুষের অধিকার আদায় এবং শোষণ বঞ্চনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান বহুবার গ্রেফতার কারারুদ্ধহন ১৯৬৬ সালে তিনি পেশ করেন বাঙালি জাতির ঐতিহাসিক মুক্তির সনদ ছয়দফা সময় নিরাপত্তা আইনে আবারগ্রেপ্তার হয়ে কারারুদ্ধ জীবনযাপন করতে থাকেন তাকে প্রধান আসামী করে দায়ের করা হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক আয়োজিত রেসকোর্স ময়দানের এক নাগরিক সংবর্ধনায় তাকে বঙ্গবন্ধুউপাধিতে ভূষিত করা হয় ১৯৭০ সালে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে কিন্তু সরকার গঠনের সুযোগ না দিয়ে প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালেরজন্য স্মগিত করেন এর প্রতিবাদে শেখ মুজিবুর রহমান মার্চ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন মার্চ ঐতিহাসিকরেসকোর্স ময়দানে স্মরণকালের বৃহত্তম জনসভায় বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন

এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম , এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম

অপারেশন সার্চলাইট স্বাধীনতার ঘোষণা:

২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে শুরু করে ইতিহাসের জঘন্যতমহত্যাকাণ্ড সেই রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে গ্রেপ্তারের পূর্বে অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরেবঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৭ এপ্রিল বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তাকেরাষ্ট্রপতি করে গঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধশেষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয় ১৬ ডিসেম্বর বাঙালির বিজয় সূচিত হয় ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন ১২ জানুয়ারি তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়েতোলার কাজে আত্মনিয়োগ করেন কিন্তু পরাজিত দল তাঁর সাফল্য বাঙালির উত্থানকে মেনে নিতে পারেনি তাই আবারশুরু হয় ষড়যন্ত্র দেশ যখন সকল বাধা দূর করে এগিয়ে যাচ্ছিল , তখন তিনি দেশীয় ষড়যন্ত্রকারী আন্তর্জাতিক চক্রেরশিকারে পরিণত হন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সামরিক বাহিনীর তৎকালীন কিছু উচ্চাভিলাষী বিপথগামী সৈনিকের হাতেবঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হন শারীরিকভাবে শেখ মুজিবের মৃত্যু হলেও তিনি অমর , অক্ষয় দেশপ্রেমিক প্রতিটি বাঙালি হৃদয়েচির অম্লান হয়ে রয়েছে একটি নাম শেখ মুজিবুর রহমান কবি অন্নদাশংকর রায়ের ভাষায় বলতে হয় যতকাল রবে পদ্মাযমুনাগৌরীমেঘনা বহমান ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান

অবদান :

দ্বিধাবিভক্ত পরাধীন জাতিকে সুসংগঠিত করে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করা এবং সঠিক নেতৃত্ব দেওয়া সহজ কাজ নয় অথচ এই কঠিন কাজটি বঙ্গবন্ধু খুব সহজেই করতে পেরেছিলেন স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার সংগ্রাম সবই পরিচালনা করেছেনশেখ মুজিবুর রহমান অসীম দক্ষতা যোগ্যতায় তাঁর ছিল মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার মতো অসাধারণ বজ্রকণ্ঠ অনলবর্ষী বক্তাহিসেবে তাঁর ছিল বিপুল খ্যাতি এর প্রমাণ পাওয়া যায় ঐতিহাসিক মার্চের ভাষণে অকৃত্রিম দেশ প্রেম , সাধারণ জনগণেরপ্রতি গভীর ভালোবাসা , অমায়িক ব্যক্তিত্ব , উপস্থিত বুদ্ধি তাঁকে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করেছে স্বাধীনতার পর তিনি খুব বেশিদিন ক্ষমতায় থাকার সুযোগ পাননি যতটুকু সময় ক্ষমতায় ছিলেন , তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকেপুনর্গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি ক্ষমতা লাভের পর কিছুদিনের মধ্যে ভারতীয় বাহিনীর দেশত্যাগকরা এবং মুক্তিবাহিনীর অস্ত্রসমর্পণ করার ঘোষণা দেন বিশ্বের ১০৪ টি দেশ স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ , জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন ইসলামি রাষ্ট্র সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে বঙ্গবন্ধুর আমলে ১৯৭২ সালের ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশের নতুন সংবিধান গৃহীত হয় ব্যাংক , বীমাসহ শিল্পকারখানা জাতীয়করণ তিনি করেন ১৯৭৪ সালে তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রথম বাংলায় বক্তৃতা করেন তাঁর নেতৃত্বে অর্জিত হয়েছিল বাঙালির হাজারবছরের স্বপ্ন স্বাধীনতা এই স্বাধীনতা বাঙালি জাতির জীবনে সূচনা করেছে এক নবদিগন্ত আত্মপরিচয়হীন জাতি খুঁজেপেয়েছে তার অস্তিত্ব আত্মমর্যাদা

উপসংহার :

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে যার নাম উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের মতো দীপ্যমান তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার দূরদর্শী, বিচক্ষণ এবং সঠিক নেতৃত্বেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি এবং স্বাধীন বাঙালি জাতিরজনক তিনি নিজের স্বার্থকে কখনোই প্রাধান্য দেননি , জাতির কল্যাণের কথাই তিনি সবসময় ভেবেছেন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button