Biography

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনী সম্পর্কে জানুন(biography of Saratchandra Chattopadhyay)

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনী বিস্তারিত:

জন্ম: 15 সেপ্টেম্বর, 1876
জন্ম:দেবানন্দপুর, বান্দেল, ভারত
মৃত্যুবরণ: 16 জানুয়ারী, 1938, কলকাতা, ভারত
ডাক নাম: ন্যারিহা
মাতা:ভুবনমোহিনী দেবী
পিতা:মতিলাল চট্টোপাধ্যায়

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনী পড়ে যে বিষয়গুলো জানতে পারবেন:

1.শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জীবনী বাংলা
2.শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উপন্যাসের নাম
3.শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর উপন্যাসের সংখ্যা
4.শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছোট গল্প সমগ্র
5.শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উপন্যাস সমূহ


ভূমিকা(Introduction):

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ই আমার প্রিয় লেখক, প্রিয় লেখক হওয়ার ও কারণ রয়েছে । তার লেখনী স্পর্শে বাংলা কথাশিল্প অর্থাৎ, উপন্যাস ও ছোট গল্প জনপ্রিয়তার শীর্ষে আরোহন করেছে। তিনি বাংলার একান্ত দরদী কথাশিল্পী ছিলেন বাঙালির বেদনার বিশ্বস্ত রূপকার হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়র লেখনিতেই বাংলার ব্যথিত মানুষের বাণীহারা বেদনা পেয়েছিল প্রকৃত প্রকাশের ভাষা। তাঁর হাতেই বাংলার নিরুদ্ধ অশুর উৎসমুখ খুলে গিয়েছিল।

বাংলার সাহিত্য গগনে যখন বঙ্কিম প্রতিভা ডুবু ডুবু করছে,, তখনই শরঙ্কালের পূর্ণচন্দ্রের স্নিগ্ধ জ্যোতি নিয়ে শরশ্চন্দ্রের বিস্ময়কর আবির্ভাব হয়েছিল।

সাহিত্যের দরবারে তিনি ছিলেন সমাজের চিরবতি, চির অবহেলিতদের জীবন কাহিনী, মর্মস্পর্শী ভাষায় রচনা করলেন তাদের বেদনাময় অশুনির্বেদ।

শরৎচন্দ্র অপ্রতিদ্বন্দ্বী কথাশিল্পী। বাংলার মাটি ও মানুষকে তিনি দেখেছেন সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে। তাইতো মানুষ তার দৃষ্টিভঙ্গিতে মুগদ হয়েছিলো। তাঁর সৃষ্টির মধ্যে তাই সাধারণ মানুষকে দেখা গিয়েছিল অসাধারণ।

তিনিই সার্থকভাবে দেখিয়েছেন সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে কী অপার মনুষ্যত্বের মহিমা; অনুভব করেছেন বাঙালির সীমিত।


অনুশীলন ও জীবন(Practice and life):

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৫ সেপ্টেম্বর হুগলী জেলার দেবানন্দপুর গ্রামে অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৮৭৬ সালে জন্ম গ্রহণ করেন।

তাঁর পিতা মতিলাল চট্টোপাধ্যায় ছিলেন একজন সরল মানুষ। তিনি সংস্কারমুক্ত এক সাহিত্যিক মনের অধিকারী ছিলেন।

শরৎচন্দ্রের সাহিত্যিক মানসিকতার ওপর পিতার প্রভাব কোনো সন্ধেহ ছাড়াই গভীর ছিল ।মাতা ছিলেন অতি সহিষ্ণু ও সহৃদয়া রমণী।


শরশ্চন্দ্রের দরদী চরিত্ৰভাবনা মাতার সহৃদয়তার দ্বারা অনেকটাই প্রভাবিত হয়েছে।ছেলেবেলা থেকেই অসহনীয় দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে শরচ্চন্দ্রকে বড় হতে হয়েছিল তাকে।

ভাগলপুরে মামার বাড়িতে তার কৈশারও যৌবনের খানিক অংশ কেটেছে।তাঁর বহু রচনাতেই ভাগলপুরের মানুষ, অরণ্য, প্রকৃতি, নদী, প্রান্তর গুরুত্বপূর্ণ স্থান উল্লেখ করেছেন তিনি।

মাতুলালয় ভাগলপুরে থাকা কালে শরচ্চন্দ্র এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কিন্তু অর্থাভাবে তাঁর উচ্চশিক্ষার পথ একেবারে রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল।

সংসারে বীতশ্রদ্ধ হয়ে শরচ্চন্দ্র কিছুকাল নিরুদ্দেশ হন। সেই কয়েক বছর তিনি সন্ন্যাসীদের দলে ছিলেন।


পিতৃবিয়োগের পর শরৎচন্দ্র জীবিকা অর্জনের জন্য স্বদেশ ত্যাগ করে সুদূর রেঙ্গুনে যাত্রা করলেন। সেখানে তিনি প্রায় চৌদ্দ বছর ছিলেন  এবং এই প্রবাসে থাকাকালীন সময়ে তিনি কথাশিল্পী হিসেবে পরিচিত হন।

প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞান বিষয়ে তার গভীর অধ্যয়ন ওঅনুশীলনে তা আরও পরিশীলিত ও পরিণত হয়ে ওঠে। ১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি ৬২ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের।

শিল্পসৃষ্টি ও সাহিত্যকৃতি(Art and literature):

শরৎচন্দ্রের শিল্পসৃষ্টির মূল উৎস ছিল সহমর্মিতা ও একাত্মবোধ, যা তাকে সহায়তা করেছে সমাজের নিম্নশ্রেণির মানুষদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশতে, তাদের দুঃখক্লান্ত জীবনের সান্নিধ্যে এসে বিচিত্র অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হতে। মানুষের গড়া সমাজ ও সমাজের গড়া মানুষ। তাইতো তিনি হয়েচিলেন সমাজের নিম্নশ্রেণির মানুষদের বন্ধু।


সম্পর্কে সুগভীর অভিজ্ঞতা সেকালের বাংলাদেশের কোন কথাশিল্পীরই ছিল না। প্রগাঢ় বাস্তবধর্মিতা, সুগভীর জীবনবোধে এবং অভিজ্ঞতাই কথাসাহিত্যের মৌলিক উপাদান। উপন্যাস যে মুখ্যত সমাজবদ্ধ বাস্তব জীবনেরই প্রতিচ্ছায়া, শরৎচন্দ্রের রচনাতেই তা প্রথম সার্থকভাবে
প্রমাণিত হয়েছিল।

শরৎচন্দ্র নিজেই লিখেছেন— 

আমার উপন্যাসের অধিকাংশ চরিত্র ও ঘটনা আমার স্বচক্ষে দেখা।”


শরৎচন্দ্রের সাহিত্যকৃতিতে ছোটগল্পের
সংখ্যা খুব বেশি ছিল না খুবই  কম ছিল, তারউপন্যাসের সংখ্যাই ছিল তুলনমূলকভাবে বেশি। বিধৃত ‘মহেশ ছিল শরৎচন্দ্রের এক অনবদ্য ছোটোগল্প ।

সংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের দিকটি তিনি এই গল্পে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। আর একটি গল্প ‘রামের সুমতি’ও তার অন্যতম শক্তিশালী রচনা ছিল। এই গল্পের কিশোর চরিত্র সম্পর্কে শরৎচন্দ্র এক আশ্চর্য মনের পরিচয় দিয়েছেন।

কিশোরের রাম তাঁর এক অপূর্ব চরিত্র সৃষ্টি। শরৎচন্দ্রের উপন্যাসগুলো মূলত বাঙালির পারিবারিকজীবনকে আশ্রয় করেই রচিত। বড়দিদি’, ‘বিরাজবৌ’, ‘বামুনের মেয়ে, প্রভৃতি উপন্যাসের মধ্যে পারিবারিক জীবনের নানা বৈচিত্র্য লক্ষণীয় ছিল। পরিবারকেন্দ্রিক জীবনে নারীকে এক অসামান্য ভূমিকায় দেখিয়েছেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

যৌথ পারিবারিক জীবনে নরনারীর প্রেমের সঙ্গে সঙ্গে স্নেহপ্রীতি, বাৎসল্য, ঈর্ষা, স্বার্থপরতা এসব বৃত্তির পরিচয় এমনভাবে দেখানো হয়েছে যে, তা একান্তভাবে বাঙালির ঘরের সামগ্রী হয়ে ওঠেছে।


চরিত্রহীন’, ‘গৃহদাহ প্রভৃতি উপন্যাসে শরৎচন্দ্র যৌথ পারিবারিক ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাঁর মনন, চিন্তন ও ভাবনাকে আরও বিস্তৃততর ক্ষেত্রে উপস্থাপিত করেছেন।

নারীর সাময়িক ভ্রান্তি, আবিলতা যে নারীত্বের শাশ্বত মহিমাকে আচ্ছন্ন করতে পারে না, এই বিশ্বাসই শরৎচন্দ্র তার
উপন্যাসে প্রতিপন্ন করতে চেয়েছেন ও সফলও হয়েছেন।

বাংলা উপন্যাসের ক্ষেত্রে এ নতুন ভাবনার পথ উন্মোচনের বিশেষ কৃতিত্ব ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ছিল।


তিনি ছিলেন চিরন্তন নারীসত্তার অপরূপ রূপকার। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। নারীজীবন সম্পর্কে গভীর সংবেদনশীল ভাবনা ছিলসমাজের দরিদ্র,  মানুষের সঙ্গে নির্যাতিতা নারীহৃদয়ের অকথিত বাণীকেও শরৎন্দ্রই বাংলা সাহিত্যে প্রথম রূপ দিতে প্রয়াসী হয়েছেন।


বাংলার সমাজচিত্র ও শরৎচন্দ্র রাজা রামমোহনের রায়ের সতীদাহ নিবারণ এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ প্রবর্তন বাংলাদেশে নারী বিগ্রহেরকিছুটা উপশম ঘটালেও  অন্তরালে নিয়ত রচিত হচ্ছিল নারীসমাজের পচন ও অবক্ষয়ের নিত্য নতুন করুণ কাহিনী।

অন্যদিকে, কৃত্রিমজাতিভেদকে হাতিয়ার করে ব্রাহ্মণ-সমাজ সমাজের নিম্নশ্রেণির মানুষগুলোর ওপর শুরু করেছিল হৃদয়হীন লাঞ্ছনা ও মানবতার দুঃসহ অপমান। তার ওপর
লর্ড কর্নওয়ালিশ প্রবর্তিত জমিদারি প্রথায় ক্ষমতাবান দাম্ভিক জমিদার শ্রেণি ব্রাহ্মণ সমাজের ভণ্ডামির প্রশ্রয়ে স্ফীতকায় হয়ে অকথ্য অত্যাচারে তাদের জীবনকে করে তুলেছিল দুর্বিষহ। শরশ্চন্দ্র বাংলার সেই ব্যথাদীর্ণ বেদনার ওপর বুলিয়ে দিলেন সমবেদনার স্নিগ্ধ শীতল করস্পর্শ।

তিনি ন্যায়বিচারের আশায় সেই নিপীড়িত, বঞ্জিত, হতভাগ্যদের করুণ কাহিনীর অন্তরালে আর্জি পেশ করলেন মানবতার বিচারশালায় ।



ভাষা ও শিল্পরীতি (Language and art)

শরৎন্দ্রের রচনার প্রধান আকর্ষণ ছিল তার ঋজু ভাষা ও শিল্পরীতি। সাধারণ মানুষের মনের কথা মুখের ভাষাকে তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর রচনায়। তিনি সাধুভাষা ও চলিত ভাষার সমন্বয় সাধন করেছেন।

সাধুভাষার ঐশ্বর্য ও ঋদ্ধি এবং চলিত ভাষার সৌকর্য ও সিদ্ধি এ উভয়ের সামঞ্জস্য বিধানের প্রয়াস তাঁর রচনায় সর্বত্র লক্ষ করা যায় । এই রচনাগত বৈশিষ্ট্যই তাঁর সাহিত্যের প্রধান সৌন্দর্য এবং তার সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব বা স্টাইলের ভিত্তি ছিল।

শরশ্চন্দ্রের ভাষা ছিল সংযত ও শান্ত । ভাষার আতিশয্য বা উচ্ছাসের তিনি ছিলেন বিরোধী। শব্দপ্নি প্রয়োগের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অতি সতর্ক । ভাষার সংক্ষিপ্ততা ও সংযম তার রচনাকে শিল্পসমৃদ্ধ এবং অনবদ্য করে তুলেছিল।

 শেষ কথা (In conclusion):

শরচ্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সমাজের সকল স্তরের মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন। আর তাইতো বাঙালি জাতি তার কাছে নানাভাবে ঋণী হয়ে আছে।কেবল বাঙালি জাতিই নয়, সমগ্র ভারতবর্ষ এবং বাংলাদেশ শরশ্চন্দ্রের কাছে অপরিশােধ্য ঋণে আবদ্ধ হয়ে আছে।

 

রবীন্দ্রনাথের কথায় বলা যায়,

দেশের হৃদয় তারে রাখিয়াছে ধরি।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবন ভিত্তিক ভিডিও:

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button