বাংলা রচনা সমগ্র

সময়ের সদ্ব্যবহার / মানবজীবনে সময়ানুবর্তিতার মূল্য (রচনা)

ভূমিকা :

মানব জীবনে সময় বড় স্বল্প কিন্তু কাজ অনন্ত অফুরন্ত তাই কবি রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে হায়রে হৃদয় তোমার সঞ্চয়দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয় নাই নাই , নাই যে সময় পৃথিবীর মানুষের চিরন্তন বাণীহারা কান্না— “ নাইনাই , নাই যে সময় পৃথিবীর আকাশবাতাস , অরণ্যপর্বত ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত করে ওঠে সেই এক হাহাকারময় ক্রন্দন– “ নাইনাই , নাই যে সময় অনন্ত প্রসারিত সময়ের যাত্রাপথ পৃথিবীর পার্থিব মানুষ সময়ের সেই পথরেখা ধরে অগ্রসর হয় সময়ের মতো মানবজীবন যদি অন্তহীন হতো , তাহলে দুঃখ থাকতোনা মানুষের। সময় নিরবধি কিন্তু মানবজীবন সংক্ষিপ্ত এখানেই গরমিল মানুষ চায় তার সংক্ষিপ্ত জীবনায়তনের মধ্যে বৃহত্তর কর্মের উদযাপন কিন্তু সময় তা মঞ্জুর করে না কর্মউদযাপনের পর্বেই তার বিদায়ের ডাক এসে পড়ে মানুষের কাছে সময় তাই অমূল্য সম্পদ

সময়ের মূল্যবোধের অর্থ :

প্রকৃতপক্ষে সময়ের যথার্থ মূল্যবোধই জীবনে সাফল্য অর্জনের সোপান সময়ের মূল্যবোধ হলো যে সময়ের কাজ তা সেই সময়েসম্পাদন করা যে সময়মতো কাজ করে না , পরাজয়ই হয় তার ভাগ্যলিপি সময়ের এই অবহেলার জন্যেই তাকে একদিনঅশ্রুমোচন করতে হবে যে কৃষক সময় মতো ফসলের বীজ বপন না করে আলস্যে সময় অতিবাহিত করে , সে কখনো ফসলওঠার সময় ভালো ফসল আশা করতে পারে না কেননা , যা চলে যায় তা চলেই যায় এবং চিরকালের জন্য চলে যায় মানবজীবনেও সেই একই কথা জীবনে যখন শক্তি থাকে , সামর্থ্য থাকে , তখন আলস্যে অযথা কালক্ষয় করে জীবন কাটালেজীবন সায়াহ্নে অবশ্যই দুঃখভোগ করতে হবে অতএব , নির্দিষ্ট সময়ে কর্তব্য সম্পাদনের জন্য বিশেষভাবে যত্নবান হতে হয়

মানবজীবনে সময়ের মূল্য :

সময় অনন্ত , কিন্তু তা সীমাবদ্ধ তার এক প্রান্তে জন্ম , অন্য প্রান্তে মৃত্যু এই মৃত্যুর শাসনে জীবন সদা সঙ্কুচিত মানুষ চায়সময়ের অন্তহীনতার মতো অন্তহীন জীবন , কিন্তু পায় না মানবজীবনের চরম ট্রাজেডি এখানেই পলায়নপর সময়ের দিকেতাকিয়ে বিষাদময় কণ্ঠে কবি বলেন , “ দুই প্রান্তেই ঘুম , ঘুমের অন্ধকার , মাঝখানে শুধু একটুখানি চোখ মেলে জীবন জীবনের এই সীমাবদ্ধতার জন্য বাংলার কবিও অশ্রু বিসর্জন করেছেন , “ এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা মধ্যখানে চরা , এরই নামজীবনযা শুধু ঘণ্টা আর মিনিটের সমাহার মাত্র জীবন অনন্ত সময়ের ভগ্নাংশ মাত্র জীবনের এত সীমাবদ্ধতার জন্যেইসময় আমাদের কাছে পরম আকর্ষণীয়।

সময়ের সদ্ব্যবহার :

সময়ের সদ্ব্যবহার ব্যক্তি মাত্রই কাম্য প্রত্যেক মানুষকেই একথা ভাবতে হবে যে , যতক্ষণ কর্মক্ষমতা আছে ততক্ষণ কোনো নাকোনো কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে সৎ কর্ম , সৎ চিন্তা , সৎ বাক্য ইত্যাদির মাধ্যমে জীবনের প্রতিটি মূল্যবান সময়েরমূল্যায়ন করা উচিত বিশৃঙ্খলভাবে কাজ করলে চলবে না , যে সময়ের যে কাজ ঠিক সে সময় তা করতে হবে এবং তাকেযথাসম্ভব দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করতে হবে বিশ্রাম আমোদপ্রমোদ যে সময় ব্যয়িত হয় তা অপব্যয় নয় ; কারণ আমাদেরকর্মক্ষমতাকে অটুট রাখতে হলে বিশ্রাম আমোদপ্রমোদের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে

মনীষীদের সময়ানুবর্তিতা :

বিজ্ঞানী , কবি , সাহিত্যিক , শিল্পী , দেশপ্রেমিক , সাধক , তপস্বী সকলেই সময়ের সদ্ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন ছিলেন সময়েরসদ্ব্যবহার জানতেন বলেই বিদ্যুৎ আবিষ্কারক মাইকেল ফ্যারাডে অবসর সময়ে গিয়ে কৃতী বিজ্ঞানীদের বক্তৃতা শুনতেন বিশ্বনন্দিত সাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কি রেলস্টেশনে কুলি বা দোকানে বয়এর কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে গ্রন্থাগারে গিয়ে ভালোভালো বই পড়তেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর পথের লাইটপোষ্টের আলোয় লেখাপড়া করতেন সময়ের সদ্ব্যবহার করে নোবেলবিজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বল্প সময়ে জীবনে অনেক অমর লেখা পৃথিবীতে রেখে গেছেনতেমনি বিদ্রোহী কবি কাজীনজরুল ইসলামও কাজেই দেখা যায় , মহামনীষীগণ সময়ের মূল্য দিতে জানতেন আর সেজন্যই তারা জগদ্বিখ্যাত হয়েছেন

ছাত্রজীবনে সময়ের মূল্য :

ছাত্রজীবনই জীবনকে গড়ে তোলার প্রকৃষ্ট সময় এটিই মানুষের চরিত্র এবং ব্যক্তিত্ব গঠনের শ্রেষ্ঠ সময় তাই প্রত্যেক ছাত্রেরইসময়ের সদ্ব্যবহার করা উচিত যে ছাত্র বছরের প্রথম থেকে বিষয়ানুগ অগ্রাধিকার দিয়ে পড়াশুনা চালিয়ে যায় , সাফল্যেরস্বর্ণশিখরে আরহরণ তার জন্য সহজতর হয় তবে সারাদিন পড়ালেখার একঘেয়েমির মাঝে বৈচিত্রও প্রয়োজন এজন্যপড়ারসময় পড়া , খেলার সময় খেলা ” – এটিই হবে তাদের সময়ের সদ্ব্যবহারের মূলমন্ত্র আর তিল তিল করে সময়ের সদ্ব্যবহারকরলে সাফল্য অবধারিত

সময় অপচয়ের পরিণতি :

আলস্য, অনিয়মানুবর্তিতা, পরমুখাপেক্ষিতা, উদাসীন্য ইত্যাদি বদঅভ্যাসের দরুণ সময় নষ্ট হয়। আর মানুষের মধ্যে এসবঅভ্যাসের প্রাচুর্য দেখা যায়। সময়কে চোখে দেখা যায় না, তার অনন্ত যাত্রার সুদূর ঘণ্টাধ্বনিও শোনা যায় না।

মানুষ তাই মনে করে, সময়ও বুঝি তার আলস্যের অনড় পাথরের মতো স্থির হয়ে আছে। তাই সময় পৃথিবীর অলস,কর্মবিমুখ মানুষদের ফাকি দিয়ে তার অনাদি যাত্রাপথে প্রস্থান করে। সে কিন্তু পৃথিবীর সেই অলস, কর্মবিমুখদের আলস্য কর্মবিমুখীতাকে ক্ষমা করে না। সে তাদের কপালে দুঃখময় ভবিষ্যতের অভিশাপ এঁকে দিয়ে প্রস্থান করে। কিন্তু যারা আলস্য জড়তা পরিহারকরে নিজেদের শক্তিসামর্থ্যকে স্বদেশ বিশ্বের কল্যাণকর কর্মে নিয়োজিত করে, তাদের মাথায় কালের আশীর্বাদ ঝরে পড়ে। তারা কখনো জীবনে দুঃখ পায় না। জীবনের সঙ্গে বা সময়ের সঙ্গে যারা প্রবঞ্চনা করে না, সময়ও তাদের সঙ্গে প্রবঞ্চনা করে না। প্রকৃত অর্থে বাচতে জানে তারাই।

উপসংহার :

ব্যক্তি জাতীয় জীবনে সময়ের মূল্য অত্যধিক। তাই সময়ের মূল্য সম্পর্কে সচেতন থেকে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে যথাযোগ্যকাজে লাগানোর মধ্যে জীবন সুন্দর সার্থক হয়ে উঠতে পারে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button